পরীক্ষা নিয়ে সরকার রেড অ্যালার্ট জারি করেছে। সরকারের সব বিভাগ এখন এটা মানছে যে প্রশ্নফাঁসের কবলে পড়ে ২০১৮ সালের মাধ্যমিক পরীক্ষা কার্যত প্রহসনে পরিণত হয়েছে। সমাজের সর্বস্তরের মানুষ যেমন সমালোচনায় মুখর হয়ে উঠেছে, তেমনি একটি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারিসহ দুটি কমিটি করে দিয়েছেন। তার একটি প্রশাসনিক কমিটি ইতিমধ্যে কাজও শুরু করেছে, অপর কমিটিও শিগগির কাজ শুরু করবে। আমরা আশা করব, সরকার এবং আদালতের এসব উদ্যোগ সত্যিকারভাবেই আমাদের সংকটাপন্ন শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতি ঘটাবে।

প্রথমেই এটা স্পষ্ট করা দরকার যে স্বাধীনতার পর গত ৪৬ বছরে শত ব্যর্থতা সত্ত্বেও শিক্ষাক্ষেত্রে আমাদের সাফল্য সামান্য নয়। বছরের প্রথম দিনে দশম শ্রেণি পর্যন্ত সব শিক্ষার্থীর হাতে পাঠ্যবই পৌঁছে দেওয়া, মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত ছাত্রছাত্রীর সংখ্যাসাম্য অর্জন, দেশের সব প্রাথমিক স্কুলের দায়িত্ব গ্রহণ কম কৃতিত্বের কথা নয়। তা ছাড়া প্রায় শতভাগ স্কুলবয়সী ছেলেমেয়েকে স্কুলে নিয়ে আসতে পারা, উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত ছাত্রী উপবৃত্তি প্রদান শিক্ষাক্ষেত্রে আমাদের সাফল্যের কীর্তিবহ। সবচেয়ে বড় সাফল্য, আমার বিবেচনায়, জনগণকে শিক্ষার স্বপ্ন দেখাতে পারা।

কিন্তু আমাদের সব সাফল্য ম্লান হয়ে যাচ্ছে পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসে, পরীক্ষা ফলের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ায়। পরীক্ষায় দুর্নীতি, নকল ইত্যাদি আবার নতুনভাবে ফিরে এসেছে। মানুষ সাধারণভাবে বিশ্বাস করছে যে প্রাথমিক থেকে সর্বোচ্চ পরীক্ষায় পাসের যে উচ্চ হার, তা অবিশ্বাস্য এবং তার মধ্যে জারিজুরি আছে। সেখানে বাস্তবতার প্রতিফলন নেই। তার চেয়েও বড় অভিযোগ, শিক্ষার মানের ক্রমাবনতি। এমনকি, সরকারি সমীক্ষায়ও এটা প্রমাণিত হয়েছে যে শিখনফলের সঙ্গে পরীক্ষায় উচ্চ পাসের ও গ্রেডের কোনো সামঞ্জস্য নেই। অর্থাৎ শিক্ষায় একটা মোটা ফাঁকির জায়গা তৈরি করা হয়েছে এবং মানুষকে এমন এক মিথ্যা গল্পে বশীভূত করার চেষ্টা করা হচ্ছে, যার সঙ্গে বাস্তবের বিস্তর ফারাক। রবীন্দ্রনাথ বলতেন, পড়তে পারা এবং পড়তে না পারা মানুষের মধ্যে শ্রেণিবৈষম্য ঘটে যায়। কিন্তু বাংলাদেশে শিক্ষার সংকট শুধু শিক্ষিত ও অশিক্ষিতজনে সীমাবদ্ধ নয়; বাংলাদেশে অশিক্ষার চেয়ে কুশিক্ষার প্রাদুর্ভাব মাত্রাতিরিক্ত রকম বেশি। প্রকৃতপক্ষে, এখানে যার যত বড় ডিগ্রি আছে, সে তত বেশি অমানুষ হয়ে উঠছে। দেশের সকল শ্রেণির নাগরিকেরাই এ কথা এখন প্রকাশ্যে বলাবলি করছে।

আট বছর ধরে বাংলাদেশে একটি নতুন সমস্যা নাগরিকদের চরমভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। তা হলো পঞ্চম শ্রেণির সমাপনী এবং অষ্টম শ্রেণির জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষার প্রবর্তন। দেশের বিশিষ্ট নাগরিক ও শিক্ষাবিজ্ঞানীরা এই দুই পরীক্ষাকে শিশুদের ওপর রীতিমতো জুলুম হিসেবে চিহ্নিত করেছেন এবং বারবার তা বন্ধ করার আবেদন জানিয়েও ব্যর্থ হচ্ছেন। সরকারি বয়ানে এই দুই পরীক্ষা নাকি জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র হলো, এই দুই পরীক্ষা দেশে পরীক্ষা ব্যবস্থাকেই তথা আগামী প্রজন্মকে একেবারে শৈশব থেকে দুর্নীতিতে হাতেখড়ি দিচ্ছে। পরীক্ষায় সোনালি প্লাসের মোহগ্রস্ত এখন গোটা জাতি এবং অভিভাবকেরাও সেই অসম দৌড়বাজির শিকার। তার বিষময় ফল ফলতে শুরু করেছে শিশুদের মনোবৈকল্যের বিস্তারে এবং সাইবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ায়। কেননা, একেবারে শিশুকাল থেকেই শিশু এক অজানা ইঁদুরদৌড়ে শামিল হয়ে শেষ পর্যন্ত অপরাধ জগতের বাসিন্দা হয়ে যাচ্ছে। প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাদের বয়স এ কথার সারবত্তা প্রমাণ করে। এভাবে চলতে থাকলে হয়তো নতুন এই রোগের নামকরণ হবে ‘এক্সাম সিনড্রোম’। শিক্ষা মনোবিজ্ঞানীরা এই সমস্যা সমাধানে অবিলম্বে সমাপনী ও জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা বন্ধের দাবি জানাচ্ছেন।

এবারের মাধ্যমিক পরীক্ষার সব বিষয়ের প্রশ্নফাঁস জাতিকে এক কঠিন সত্যের মুখোমুখি করেছে। সরকারের সব নিবারণমূলক পদক্ষেপকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দুর্বৃত্তরা একের পর এক প্রশ্ন ফাঁস করে গেছে। শুধু সেখানেই তারা থামেনি, আসন্ন উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের আগাম নিশ্চয়তা দিয়ে তারা প্রকাশ্যে সরকারের কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করে বসেছে। কিন্তু তাদের দমনে এখন পর্যন্ত খুব আশাব্যঞ্জক কোনো অগ্রগতির কথা আমরা শুনিনি। তবে গোয়েন্দা তৎপরতায় সন্দেহের তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে এবং দুর্বৃত্তদের আস্তানা দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশ পর্যন্ত বিস্মৃত হতে পারে বলে তারা ধারণা করছে। যদিও শিক্ষা মন্ত্রণালয় শুধু শিক্ষকদের দিকেই সন্দেহের কামান দাগছে।

পরীক্ষা হলো শিখনফল যাচাইয়ের একটি পদ্ধতি। সে পদ্ধতি কেন বাংলাদেশে এভাবে ভেঙে পড়ল, তার নিরাসক্ত অনুসন্ধান জরুরি হয়ে উঠেছে। স্কুল-কলেজে শেখানোর কথা ‘শিখন-কৌশল’ বা ‘কীভাবে শেখা যাবে তার কৌশল জানার চেষ্টা’ এবং তাতে শিশুদের অভ্যস্ত করে তোলা। কিন্তু বাংলাদেশে শিক্ষা পরিণত হয়েছে এক ‘জ্ঞান গেলানো নির্যাতন ব্যবস্থা’। ফলে শিশুরা ‘কীভাবে শেখা যায়’ তা না শিখেই জ্ঞানের সাগরে সাঁতার দিতে নেমে অকালে ডুবে মরছে। আর অভিভাবকেরা ভাবছেন, তাঁর সন্তান কেন এক মহাজ্ঞানী হিসেবে পরীক্ষায় সোনালি প্লাসের অধিকারী হবে না? এ জন্য তাঁরা সন্তানদের পেছনে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ঢালতেও প্রস্তুত। করছেনও তাই। সন্তানের পেছনে দুই গণ্ডা পণ্ডিত নিয়োগ, কোচিং সেন্টারে পাঠিয়ে তাঁরা সন্তানকে দিগগজ পণ্ডিত বানানোর নেশায় মেতেছেন। শিক্ষার প্রতি মানুষের এ ধরনের স্বপ্নকে পুঁজি করে একশ্রেণির দুর্বৃত্ত মেতে উঠেছে কোচিং-বাণিজ্যে, নোট-গাইড রচনায় ও প্রকাশে। এভাবে বাংলাদেশে এক বিশাল অবৈধ বাণিজ্য গড়ে উঠেছে।

পরীক্ষায় পাসের অতি উচ্চ হার এবং তুলনায় শিক্ষার মানের ক্রমাবনতির পরিপ্রেক্ষিতে বেশ কয়েক বছর কিছু মানুষ বহুনির্বাচনী অভিজ্ঞা বাদ দেওয়ার সুপারিশ করছেন। এবারে নাকি প্রশ্নের শুধু বহুনির্বাচনী অংশই ফাঁস হয়েছে। তাই আগামী বছর থেকেই বহুনির্বাচনী অংশ বাদ দেওয়া হবে বলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে ঘোষণা করা হচ্ছে। কিন্তু একটা প্রশ্নের জবাব জানা নেই। বহুনির্বাচনী প্রশ্ন করা হয় চার সেট করে। প্রতিটি বিষয়ের চার সেট বহুনির্বাচনী প্রশ্নই কি ফাঁস হয়েছে? যদি মাত্র এক সেট প্রশ্ন ফাঁস হয়, তবে তার উত্তরমালা প্রতি চারজনের একজনকে সুবিধা দেবে; কিন্তু তিনজন ভুল উত্তর দিয়ে ক্ষতির শিকার হবে। বাংলাদেশে হুটহাট সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। বহুনির্বাচনী প্রশ্নের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বলা হচ্ছে, বহুনির্বাচনী প্রশ্ন তুলে দেওয়া হবে। কিন্তু বহুনির্বাচনী প্রশ্ন বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত একটি নৈর্ব্যক্তিক শিখনফল যাচাই পদ্ধতি। তা ছাড়া এই ৩০ নম্বর কোথায় যাবে? শতভাগ প্রশ্নই কি সৃজনশীল হবে? কিন্তু শিক্ষামন্ত্রী তো বলেই চলেছেন, শিক্ষকেরা সৃজনশীল প্রশ্ন বোঝেন না, প্রশ্ন করতেও পারেন না। তাহলে শতভাগ সৃজনশীল প্রশ্ন হলে শিক্ষাব্যবস্থা যে আরও সংকটে পড়বে, তা বলাই বাহুল্য।

আগামী বছর যারা মাধ্যমিক পরীক্ষা দেবে, তাদের শিক্ষাকালের ২৪ মাসের মধ্যে ১৪ মাস অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। তাই ২০১৯ সাল থেকে বহুনির্বাচনী পরীক্ষা বাদ দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কর্তৃপক্ষকে তা মনে রাখতে হবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশে শিক্ষক এবং শিক্ষাবিজ্ঞানীর মধ্যে কোনো পার্থক্য করা হয় না। তাই শিক্ষাপদ্ধতি নিয়ে যাঁরা গবেষণা করেন, সেই শিক্ষাবিজ্ঞানীরা এ দেশে উপেক্ষিত থাকেন। তাঁদের মতামত নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করে না যেমন সরকারপক্ষ, তেমনি গণমাধ্যমও। তারা বড়জোর শিক্ষকের মতামত জানতে চায়, কিন্তু মানে আমলাদের সিদ্ধান্ত। কিছু জনপ্রিয় শিক্ষকের যেসব মতামত আমরা অহর্নিশ শুনছি এবং পাঠ করছি, তাতে সংকট ক্রমে জটিল হচ্ছে। অসুখ হলে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র নিতে হবে, ওষুধ বিক্রেতার কথামতো ওষুধ খেলে মৃত্যুঝুঁকিই বাড়বে। আবার মামলায় জড়ালে উকিলের কাছে না গিয়ে ডাক্তারের কাছে দৌড়ে কোনো লাভ নেই। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় শেষ কথা বলার মালিক মোক্তার হলেন আমলারা। তাঁরাই দেশের হর্তাকর্তা বিধাতা, তাদের অমৃতবাণীই শেষ কথা।

পরীক্ষায় বহুনির্বাচনী থাকা না-থাকার প্রশ্নের বিজ্ঞানসম্মত জবাব দিতে পারেন একমাত্র কারিকুলাম বিশেষজ্ঞরা। তাই শিক্ষার সংকট মোচনে শিক্ষাবিজ্ঞানী ও পাঠ্যক্রম বিশেষজ্ঞদের মতামত জানা খুব জরুরি।

Share.

Comments are closed.

Exit mobile version