আলী রীয়াজ : নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের দুটি মসজিদে সন্ত্রাসী হামলার পর প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডার্ন যে ভূমিকা নিয়েছেন, তা সারা পৃথিবীতেই প্রশংসিত ।
সংকটেই নেতৃত্বের পরীক্ষা হয়। ছোট সংকটে পরীক্ষার মাত্রা যদি ছোট হয়, তবে বড় সংকটে সেই মাত্রা কেবল আনুপাতিকভাবে বৃদ্ধি পায় না, বৃদ্ধি পায় কয়েক গুণ। রাজনীতিতে যাঁরা সংশ্লিষ্ট এবং রাষ্ট্র পরিচালনার কাজে যাঁরা নিয়োজিত, তাঁরা এই বিষয় উপলব্ধি করতে পারেন বলেই আমরা অনুমান করি; সাধারণ মানুষ সেই পরীক্ষা প্রত্যক্ষ করেন, বিচার করেন। যে সংকটের প্রকৃতি ও পরিধি বৈশ্বিক, তা মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের কর্ণধারদের ভূমিকা সারা পৃথিবীতে কেবল দৃশ্যমান হয় তা নয়, তার প্রভাব পড়ে দুনিয়াজুড়েই। ১৫ মার্চ নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের দুটি মসজিদে সন্ত্রাসী হামলায় ৫০ জন নিহত এবং আরও ৫০ জন আহত হওয়ার পরে দেশের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডার্ন যে ভূমিকা নিয়েছেন, তা সারা পৃথিবীতেই প্রশংসিত হচ্ছে। সন্ত্রাসী হামলার পরে তাঁর দৃঢ়তা তাঁকে বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত এবং সংবেদনশীল নেতার অবস্থানেই কেবল উন্নীত করেনি, তাঁকে দিয়েছে এমন এক মর্যাদা, যা সাম্প্রতিক কালে আর কেউ পেয়েছেন বলে মনে হয় না।

সন্ত্রাসের ঘটনা যদিও ঘটেছে নিউজিল্যান্ডের শহরে, কিন্তু তার উৎস এবং প্রভাব যে বৈশ্বিক, সেটা আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসার কৃতিত্ব তাঁর একার নয়, কিন্তু তাতে যে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন, সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী সন্ত্রাসের বৈশ্বিক রূপ বিষয়ে তথ্যাদি জানা থাকলেও গণমাধ্যমের প্রধান অ্যাজেন্ডায় তা পরিণত হয়েছে এই নেতৃত্বের সুবাদে। কিন্তু যা সহজেই লক্ষণীয় এই সন্ত্রাসের পরে তিনি ঐক্যের, সংহতির, সহমর্মিতার কথা বলেছেন; বিভক্তির নয়।

আমরা যেমন জেসিন্ডা আরডার্নের এই নেতৃত্বের দিকে তাকাব, তেমনি দেখব অন্য রাষ্ট্রনায়ক ও সরকারপ্রধানের ভূমিকাও। শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদের এই ধারণা দীর্ঘদিনের, পশ্চিমা বিশ্বের সমাজের ভেতরের প্রতিরোধ সত্ত্বেও ইউরোপে এবং যুক্তরাষ্ট্রে তা টিকে থেকেছে। কিন্তু তার অবস্থান ছিল প্রান্তিকে। যে ঘটনাপ্রবাহ সাম্প্রতিক কালে একে শক্তিশালী করেছে, তার একটি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের উত্থান এবং অন্যটি ইউরোপে উগ্র জাতীয়তাবাদের নামে অভিবাসনবিরোধী, ইসলামবিদ্বেষী দলগুলোর বিকাশ। কেন ট্রাম্প মার্কিন সমাজে সমর্থন লাভ করেন, কেন ইউরোপে উগ্র জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটে, সে প্রসঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা অতীতেও হয়েছে, এখনো হচ্ছে। এর জন্য একটিমাত্র কারণকে চিহ্নিত করা যাবে না। কিন্তু রাষ্ট্রগুলোর অভ্যন্তরীণ নীতি ও আইন—যা চলেছে কয়েক দশকে ধরে, তা এই পথকে প্রশস্ত করেছে। এর বিস্তার হয়েছে একদেশদর্শী ভুল পররাষ্ট্রনীতি এবং নাইন-ইলেভেনের পরে মার্কিন-ব্রিটিশ প্রশাসনের উদ্যোগে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের’ নামে যে বৈশ্বিক পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে, তার কারণে। দেশে দেশে কর্তৃত্ববাদী শাসকেরা তা থেকে সুবিধা নিয়েছেন, অভ্যন্তরীণভাবে নাগরিকদের অধিকার সংকুচিত হয়েছে। দেশে দেশে চালানো যুদ্ধের পরিণতিতে লাখ লাখ মানুষের প্রাণনাশ হয়েছে।

এর পাশাপাশি যে ইসলামপন্থী সহিংস উগ্রবাদ নির্মূলের কথা বলা হয়েছিল, তা বিস্তার লাভ করেছে; অংশত এই কারণে যে, এই সব পররাষ্ট্রনীতি এবং অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা তাদের ব্যাখ্যাকে কারও কারও কাছে গ্রহণযোগ্যতা দিয়েছে; অংশত এই কারণেও যে, তারা ধর্মের নামে আরও বেশি বিভক্তি ও বিদ্বেষ তৈরি করতে পেরেছে। তারা দেখাতে চেয়েছে যে তাদের এই লড়াই হচ্ছে বিশেষ বিশেষ ধর্মের বিরুদ্ধে, মুসলমানের পক্ষে; কিন্তু তাদের এই সব সন্ত্রাসের শিকার হয়েছে সংখ্যার হিসেবে মুসলিম জনগোষ্ঠী বেশি। উপরন্তু উগ্র সহিংসতাবাদীদের আরেক অংশ অভিবাসনবিরোধী, ইসলামবিদ্বেষী, অ্যান্টি-সেমেটিক মনোভাবকে জাগিয়ে তুলেছে, তারা সংগঠিত হয়েছে, তাদের আদর্শকে বৈশ্বিক রূপ দিয়েছে। এক বৃত্তচক্রের মধ্যে ঘুরছে বৈশ্বিক রাজনীতি, যাতে লাভবান হয়েছে অস্ত্রের উৎপাদক আর জোগানদারেরা এবং যারা এই বিষয়কে রাজনীতির হাতিয়ারে পরিণত করতে পেরেছে।

এই বৃত্তচক্রের মধ্যেই আমরা দেখতে পাই সহিংস উগ্রবাদের বিস্তার-জাতীয়তাবাদের নামে, ধর্মের নামে, বর্ণের শ্রেষ্ঠত্বের নামে, নিজস্ব পরিচয় সংরক্ষণের নামে। সেই সংকটের একটি মুহূর্তে যখন জেসিন্ডা আরডার্ন একধরনের অবস্থান নেন, তখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঠিক বিপরীতে অবস্থান নেন। ক্রাইস্টচার্চের হামলার পরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যে একটি উগ্র দক্ষিণপন্থী শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী ওয়েবসাইটের সংবাদ রি-টুইট করলেন, সেটা বিস্ময়কর নয়, তাতে আমরা তাঁর অবস্থান বুঝতে পারি। ট্রাম্প যে শ্বেতাঙ্গ ‘জাতীয়তাবাদী’দের বৈশ্বিক উত্থানে উদ্বেগ প্রকাশ করলেন না, তা বিস্ময়কর নয়। কেননা, ট্রাম্পের সমর্থকদের মধ্যে এ ধরনের শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের উপস্থিতি আছে, তা ছাড়া ২০১৭ সালে ভার্জিনিয়ার শারলটসভিলে শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী, নয়া নাৎসিবাদের সমর্থক এবং সন্ত্রাসী সংগঠন কু ক্লাক্স ক্ল্যানের (কেকেকে) সদস্যরা যে সন্ত্রাস চালিয়েছিল, তখন ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া ওই সব ব্যক্তিকে বৈধতাই দিয়েছিল (‘ট্রাম্প নৈতিক অধিকার হারিয়েছেন’, প্রথম আলো, ১৮ আগস্ট ২০১৭)।

ফলে এ ধরনের ঘটনার জন্য তাঁকে প্রত্যক্ষভাবে অভিযুক্ত করতে না পারলেও এই পরিস্থিতির দায় যে তাঁর আছে, আমরা তা জানি। এই বিভাজনের রাজনীতিকে পুঁজি করেই ট্রাম্পের উত্থান ঘটেছে। শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের মতো করেই তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমার মনে হয় যে ইসলাম আমাদের ঘৃণা করে।’ তাঁর আদর্শিক অবস্থান এবং আরেক নির্বাচনের বিবেচনাই তাঁকে এখনো রাষ্ট্রনায়ক না করে একজন ক্ষুব্ধ ক্ষমতাশালী ব্যক্তিতেই সীমাবদ্ধ করে রেখেছে, যা থেকে তাঁর উত্তরণের কোনো সম্ভাবনা নেই।

কিন্তু ট্রাম্প একা নন। ক্রাইস্টচার্চের সন্ত্রাসী হামলার পরে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের আচরণ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, বিভক্তির রাজনীতি কেবল দেশের সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকে না। তুরস্কের আসন্ন নির্বাচনের প্রচারণার এক সমাবেশে এরদোয়ান তাঁর ভাষণ থামিয়ে ক্রাইস্টচার্চে হামলার ছবি বিশাল পর্দায় দেখান। নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী যখন হামলাকারীকে এক নামহীন সন্ত্রাসীতে রূপান্তরের কথা বলেন, তখন এরদোয়ান সেই সন্ত্রাসীর প্রকাশিত ইশতেহারের প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘তোমরা ইস্তাম্বুলকে কনস্টান্টিনোপলে পরিণত করতে পারবে না। তোমাদের দাদারাও এসেছিল এবং লাশ হয়ে ফেরত গেছে। কোনো সন্দেহে নেই তোমাদেরও আমরা লাশ বানিয়ে ফেরত পাঠাব।’ (ইত্তেফাক, ১৯ মার্চ ২০১৯)। এরদোয়ানের এই বক্তব্যে যে প্রতিশোধের মনোভঙ্গি, তা ইতিবাচক নয়। এ ধরনের প্রতিহিংসাপরায়ণতার পথেই এগিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ, ২০০১ সালে। সেই নীতির পরিণতি বিষয়ে কি আমরা ভালোভাবে অবহিত নই?

আমরা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কথা বিস্মৃত হতে পারব না এই কারণে যে, এই হামলায় নিহত ব্যক্তিদের তালিকায় পাঁচজন ভারতীয়ও আছেন। যে নরেন্দ্র মোদি অতীতে যেকোনো সন্ত্রাসী হামলার পরে ব্যক্তিগত টুইট থেকে শোক, সমবেদনা প্রকাশে দেরি করেননি, তিনি এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানানোর জন্য তাঁর কোনো টুইট আমরা দেখতে পাই না (স্ক্রল ডট ইন, ১৮ মার্চ ২০১৯)।

ট্রাম্প, এরদোয়ান, মোদির প্রতিক্রিয়ার আপাত পার্থক্য সত্ত্বেও এর ভেতরে একধরনের মিল আমরা দেখতে পাই—তা হচ্ছে তাঁরা এই বিভক্তির বিরুদ্ধে নিজেদের শামিল করছেন না। কর্তৃত্ববাদী শাসকেরা যাঁরা ভয়কে পুঁজি করে, মানুষের ভেতরের মৌলিক তাড়নাকে ব্যবহার করে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকেন, থাকতে চান, তাঁদের আমরা আশার কথা বলতে শুনি না। যে রাজনীতি সবার অংশগ্রহণের কথা বলে না, অংশীদারত্বের সমাজে বিশ্বাস করে না, সেই রাজনীতির প্রতিনিধির কাছে ক্রাইস্টচার্চের সন্ত্রাসী হামলা কেবল প্রতিহিংসার বিষয় কিংবা তার আদর্শিক অনুসারীদের ভূমিকাকে ছোট করার সুযোগ। ধর্ম বা দেশভেদে তাদের ভূমিকা ভিন্ন হয় না।

কিন্তু এটা কি কেবল রাষ্ট্রনায়কদের বিষয়? অবশ্যই নয়। বিশ্ব আজকে যে দুই ধরনের উগ্র সহিংস গোষ্ঠীর বিপদের মধ্যে আছে—শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী এবং কথিত ইসলামপন্থী, তাদের আচরণ এবং বক্তব্যের মধ্যে তাকালেই তা আমাদের কাছে বোধগম্য হবে। ২০১১ সালে নরওয়ের সন্ত্রাসী আন্দ্রেস ব্রেইভিক, ২০১৬ সালে অরল্যান্ডের সন্ত্রাসী ওমর মতিন, ২০১৯ সালের ক্রাইস্টচার্চের সন্ত্রাসী ব্রেনটন টারান্ট যে তাঁর চেয়ে যারা ভিন্ন, ‘অন্যদের’ একেবারে নির্মূল করে একটি শুদ্ধ সমাজের, পৃথিবীর ‘স্বপ্ন’ দেখে তা আসলে অ্যাবসলুইটিজিমের, বাংলায় যাকে বলা যায় নিরঙ্কুশতার, আদর্শের ফল। এর সহজ অর্থ হচ্ছে আমার পরিচয়, আমার আদর্শই হচ্ছে শ্রেষ্ঠ এবং চূড়ান্ত।

অ্যাবসলুইটিজিমের এই ধারণা তৈরি হতে পারে ধর্ম, জাতীয়তাবাদ বা অন্য রাজনৈতিক আদর্শের মধ্য থেকেও। মার্ক জারগেন্সমায়ার তাঁর অনবদ্য গ্রন্থ টেরর ইন দ্য মাইন্ড অব গড (চতুর্থ সংস্করণ, ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটি প্রেস, ২০১৭) দেখিয়েছেন যে, সব ধর্মের মধ্য থেকেই সহিংসতার পক্ষে যুক্তি তৈরি করেছে সন্ত্রাসীরা—তাতে ইসলাম, খ্রিষ্টধর্ম, বৌদ্ধ, শিখ, হিন্দু, ইহুদি—কিছুই বাদ যায়নি। এগুলো যেমন ব্যক্তিপর্যায়ে আছে, তেমনি আছে সাংগঠনিক পর্যায়েও। যে কারণে আমরা দেখতে পাই যে আইএস বা আল-কায়েদা যেমন বিদেশিদের আক্রমণকারী বা ইনভেইডার বলে চিহ্নিত করে, তেমনি পিটসবার্গে ইহুদিদের সিনাগগে হামলাকারী রবার্ট বাওয়ার্স মেক্সিকো এবং সেন্ট্রাল আমেরিকা থেকে আসা মানুষদের আক্রমণকারী বলেই বর্ণনা করেছে। একই ভাষ্য পাওয়া যায় ব্রেনটন টারান্ট এবং আন্দ্রেস ব্রেইভিকের ইশতেহারে।

ক্রাইস্টচার্চের সন্ত্রাসী হামলার আগেই উগ্রপন্থার এই মিল, নিরঙ্কুশতার আদর্শের কুফল বিষয়ে আমরা অবগত ছিলাম। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে আমাদের দেখার দৃষ্টিভঙ্গি, বিশ্লেষণ, আচরণের মধ্যে কি এই কুফলের ব্যাপারে সচেতনতা প্রকাশিত হচ্ছে? ঘৃণা, বিভক্তি এবং নিরঙ্কুশতার আদর্শ কী আমরা আমাদের কথায় তৈরি করে চলেছি? পশ্চিমারা সন্ত্রাসীর ধর্ম পরিচয়কে বড় করে তোলে এই যুক্তিতে কি আমরাও এক সন্ত্রাসীর ধর্মের পরিচয়কেই বড় করে তুলছি? সংকট কেবল নেতৃত্বের পরীক্ষা নেয় না, সাধারণ মানুষেরও পরীক্ষা নেয়। আমরা কি সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারছি?

আলী রীয়াজ যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির সরকার ও রাজনীতি বিভাগের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর

Share.

Comments are closed.

Exit mobile version