এশিয়ান বাংলা, ঢাকা : ব্যাংকের ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতির ঘটনায় গত তিন বছরে গ্রেফতার হয়েছে অর্ধশতাধিক। ব্যাংকগুলোর নিরাপত্তা দুর্বলতার কারণেই জালিয়াতির এ সুযোগ নিয়েছে তারা। জালিয়াতির ঘটনায় সর্বশেষ গ্রেফতার হয়েছেন শরিফুল ইসলাম নামে এক প্রতারক। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে তিনি স্বীকারও করেছেন, ব্যাংকের নিরাপত্তা দুর্বলতাই জালিয়াতির এ সুযোগ করে দিয়েছে তাকে। ব্যাংকের নিরাপত্তা ব্যবস্থা না বদলালে এ ধরনের জালিয়াতি ঘটতেই থাকবে।

গত মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে বেসরকারি ব্র্যাক, দ্য সিটি, ইবিএল, ইউসিবি ও ব্যাংক এশিয়ার কার্ড জালিয়াতির ঘটনাটি তদন্ত করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) অর্গানাইজড ক্রাইম ইউনিট। এ তদন্তে কার্ড জালিয়াতির ঘটনায় শরিফুলের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পায় তারা। এর ভিত্তিতেই কয়েক হাজার ক্লোন কার্ড ও কার্ড তৈরির বিপুলসংখ্যক উপকরণসহ তাকে গ্রেফতার করা হয়।

সিআইডির তদন্ত অনুযায়ী, সুপারশপ স্বপ্নের বনানী শাখায় কাজ করার সময় নিজের হাতঘড়িতে সংযুক্ত বিশেষ মিনি কার্ড রিডারের মাধ্যমে গ্রাহকের কার্ডের অভ্যন্তরীণ তথ্য সংগ্রহ করতেন শরিফুল ইসলাম। এরপর গ্রাহক যখন পিন নম্বর দেন, তখন কৌশলে তা দেখে নিয়ে বিল পরিশোধের পর আবার গ্রাহক চলে গেলে রি-প্রিন্ট দিয়ে কপিটা সংগ্রহ করতেন তিনি। এ কপির পেছনে পিন নম্বরটি লিখে রাখতেন শরিফুল। তারপর বাসায় গিয়ে ল্যাপটপ ও ডিভাইসের মাধ্যমে গ্রাহকের এসব তথ্য খালি কার্ডে (ব্ল্যাংক কার্ড) স্থাপন করে ক্লোন এটিএম কার্ড বানাতেন। এরপর কার্ড ব্যবহার করে কোনো একটি এটিএম বুথ থেকে টাকা তুলে নিতেন। স্বপ্নে চাকরি করলেও তার মূল পেশা ছিল ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি।

ব্যাংকের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে নির্বিঘ্নে এসব জালিয়াতি করে গেছেন শরিফুল ইসলাম। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে প্রাথমিক

জিজ্ঞাসাবাদে তিনি বলেছেন, আমাকে ধরলেও আমার মতো আরো ১০০ জন তৈরি হবে, যারা এ কাজ করতে পারে। যতক্ষণ না ব্যাংকের নিরাপত্তাব্যবস্থা বদলাবে, ততক্ষণ এ ধরনের ঘটনা ঘটতেই থাকবে।

কার্ড জালিয়াতির পেছনে ব্যাংকের নিরাপত্তা দুর্বলতা নয়, বরং গ্রাহক সচেতনতার অভাবকেই দায়ী করছেন ব্যাংকাররা। জালিয়াতির শিকার হওয়া ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সেলিম আর এফ হোসেন এ প্রসঙ্গে বলেন, কার্ড জালিয়াতির ক্ষেত্রে ব্যাংকের কোনো দুর্বলতা নেই। ডেবিট কিংবা ক্রেডিট কার্ডের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে গ্রাহকদের অনেক বেশি সচেতন হতে হবে। কার্ড ও এর গোপন পিন নম্বর নিজের কাছে সংরক্ষিত রাখতে হবে। পস মেশিনে কার্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রে কখনই চোখের সামনে থেকে কার্ডটি সরাতে দিতে নেই। কিন্তু সুপারশপে কার্ড জালিয়াতির ক্ষেত্রে গ্রাহকের কার্ড টেবিলের তলায় নিয়ে তথ্য কপি করে নেয়া হয়েছে। প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে আমরা ক্যাশবিহীন লেনদেনে ঝুঁকছি। প্রতিনিয়ত নতুন নতুন প্রযুক্তি আসছে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও শক্তিশালী হচ্ছে। জালিয়াতি প্রতিরোধে কার্ড ব্যবহারকারী গ্রাহকের সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। আমরা গ্রাহক সচেতনতা বাড়াতে নানা উদ্যোগ নিয়েছি।

ব্যাংকের নিরাপত্তা দুর্বলতা নেই দাবি করা হলেও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) জরিপ বলছে, প্রযুক্তিভিত্তিক লেনদেনের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখনো বেশ দুর্বল। বিআইবিএমের জরিপে অংশ নেয়া ৩৬ শতাংশ ব্যাংক মনে করে, যেকোনো মুহূর্তে তাদের তথ্য চুরি হতে পারে। এছাড়া ৩২ শতাংশ ব্যাংক কিছুটা কম ঝুঁকিতে রয়েছে। আর কম ঝুঁকিতে আছে ১২ শতাংশ ব্যাংক।

প্রযুক্তিভিত্তিক সেবায় অধিকাংশ ব্যাংকেরই অবকাঠামো, কার্ডের প্রযুক্তি ও তথ্য ভাণ্ডারের নিরাপত্তায় দুর্বলতা রয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মেশিনে কার্ড পাঞ্চ করার স্থানে স্কিমিং ডিভাইস বসিয়ে দেয় জালিয়াতকারীরা। ফলে সংশ্লিষ্ট মেশিনে কার্ড পাঞ্চ করা হলে কার্ডের সব তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে কপি হয়ে যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পস মেশিনে কার্ড পাঞ্চ করার আগে কৌশলে স্কিমিং ডিভাইসে কার্ডটি পাঞ্চ করে তথ্য সংগ্রহ করে অপরাধীরা। এ ঝুঁকি কমাতে এটিএমগুলোতে কার্ড পাঞ্চ করার স্থানে বিশেষ প্রতিরোধক ব্যবস্থা রাখার কথা। এছাড়া আরো বেশকিছু প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার সমন্বয়ে কাজ করে এ অ্যান্টি-স্কিমিং ব্যবস্থা। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা সত্ত্বেও বুথ বা পসগুলোয়ও এ ব্যবস্থা কার্যকর করেনি অনেক ব্যাংক।

নিরাপত্তা দুর্বলতার এ সুযোগ নিয়ে কার্ড জালিয়াতির ঘটনা ঘটছে বলে মনে করেন সিটিও ফোরাম বাংলাদেশের সভাপতি তপন কান্তি সরকার। তিনি বলেন, নির্দেশনা সত্ত্বেও দেশের বেশির ভাগ ব্যাংক তা পরিপালনে উদাসীন। শুধু কয়েকটি ব্যাংক তাদের এটিএমগুলোয় অ্যান্টি-স্কিমিং প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। অথচ এটি তুলনামূলক স্বল্পবিনিয়োগের একটি প্রযুক্তি। স্কিমিং ডিভাইস বসানো হলে তা গ্রাহকের জানার কথা নয়। অনেক ক্ষেত্রেই পিওএসগুলোর ব্যবহার ও সেগুলোর নিরাপত্তা বিষয়টি দায়িত্বহীনভাবে দেখা হচ্ছে। বিপণিবিতান কিংবা সুপারশপগুলোয় গেলে দেখা যাবে, সেগুলো কতটা অবহেলার সঙ্গে ব্যবহার করা হচ্ছে। পস মেশিন ব্যবহারে নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ব্যাংকেরও দায় রয়েছে। এটি কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না।

নিরাপত্তা দুর্বলতার সুযোগে এর আগেও জালিয়াতির অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে। ২০১৩ সালে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে কার্ড জালিয়াতির অভিযোগে চারজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। চক্রটি অন্তত ১ কোটি টাকা এটিএম বুথ থেকে কার্ড জালিয়াতির মাধ্যমে হাতিয়ে নেয়। এটিএম বুথের সিপিইউ থেকে গ্রাহকের তথ্য ও উচ্চ ক্ষমতার ক্যামেরার মাধ্যমে তাদের পাসওয়ার্ড ও পিনকোড সংগ্রহ করে চক্রটি। এরপর সংগৃহীত তথ্য ব্ল্যাংক কার্ডের ম্যাগনেটিক স্ট্রিপে ধারণের মাধ্যমে নতুন কার্ড তৈরি করা হয়। এ কার্ড দিয়েই পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট থেকে অর্থ উত্তোলন করা হয়। জানা গেছে, সংশ্লিষ্টরা ব্যাংকের এটিএম বুথগুলো দেখাশোনার কাজ করতেন। ফলে তারা বিভিন্ন এটিএম বুথ সম্পর্কে জানতেন। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে কার্ড জালিয়াতির একই ধরনের ঘটনা ঘটে ইস্টার্ন, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ও দ্য সিটি ব্যাংকে।

সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (অর্গানাইজড ক্রাইম) মোল্ল্যা নজরুল ইসলাম বলেন, এটিএম কার্ডে ব্যবহূত ম্যাগনেটিকের কারণেই ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। অপরাধীরা এ প্রযুক্তি ট্র্যাকিং করে জালিয়াতি করছে। আমরা ব্যাংকগুলোকে ম্যাগনেটিকের পরিবর্তে চিপ সিস্টেম ব্যবহারের কথা বলেছি। ব্যাংকগুলো এরই মধ্যে এ বিষয়ে কাজ শুরু করেছে। আশা করছি, তিন-চার মাসের মধ্যে এ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

আউটলেটগুলোতে দক্ষ ব্যবস্থাপনার অভাবে দুর্ঘটনা ঘটছে জানিয়ে তিনি বলেন, আউটলেটে প্রযুক্তি ব্যবহারের মতো দক্ষ লোক না থাকায় জালিয়াতির ঘটনা ঘটছে। শুধু ব্যাংকের প্রযুক্তি নিরাপত্তার দুর্বলতা নয়, একই সঙ্গে সুপারশপগুলো বিশেষ করে ক্যাশ কাউন্টারে লোক নিয়োগে সতর্ক থাকতে হবে।

Share.

Comments are closed.

Exit mobile version